মুহাম্মদ এমরান লামা (বান্দরবান)
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন উন্নয়নের নতুন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপিত হচ্ছে, তখন বান্দরবানের লামা উপজেলার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের বনপুর-সাঙ্গু অঞ্চলের প্রায় ৩০টি গ্রাম যেন সেই উন্নয়নের মানচিত্রের বাইরেই রয়ে গেছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক অবকাঠামোর ঘাটতিতে প্রতিদিন সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন হাজারো মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মিললেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই সীমিত। নির্বাচন এলেই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছুটলেও ভোট শেষ হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মুখ দেখে না।
সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট যোগাযোগ ব্যবস্থায়। ইয়াংছা হতে বনপুর ত্রিশডেবা যাতায়াতের একমাত্র রাস্তার অবস্থা খুবই ভয়াবহ। বর্ষা মৌসুমে এ রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে চলাচলের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়ে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা, কোথাও আবার ভাঙা রাস্তা ও ছোট ছোট গর্তের কারণে মানুষকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন শিক্ষার্থী, কৃষক, গর্ভবতী নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নিতে অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যায়। অ্যাম্বুলেন্স তো দূরের কথা, অনেক এলাকায় মোটরসাইকেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। বাধ্য হয়ে রোগীকে বাঁশের খাটিয়া বা স্থানীয়ভাবে তৈরি স্ট্রেচারে বহন করে মূল সড়কে নিয়ে আসতে হয়। জরুরি চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ার কারণে অনেক সময় অপূরণীয় ক্ষতির ঘটনাও ঘটে বলে দাবি করেন তারা।
শিক্ষা খাতেও রয়েছে একই চিত্র। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। বর্ষাকালে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পান। ফলে ঝরে পড়ার হার বাড়ছে এবং পিছিয়ে পড়ছে পুরো একটি প্রজন্ম।
কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের আরেকটি বড় সমস্যা উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করা। রাস্তার অভাবে কৃষকদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হয়। অনেক সময় ন্যায্যমূল্য না পেয়ে লোকসান গুনতে হয়। এতে কৃষকের আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও বনপুর-সাঙ্গুর বিস্তীর্ণ জনপদে সেই উন্নয়নের ছোঁয়া খুব কমই পৌঁছেছে। ইয়াংছা হতে বনপুর ত্রিশডেবা যাতায়াতের একমাত্র সড়ক, ছোট ছোট সেতু, কালভার্ট, কিংবা প্রয়োজনীয় জনসেবামূলক স্থাপনা নির্মাণের দাবিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই উপেক্ষিত রয়েছে বলে তাদের দাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও মৌলিক সেবার ঘাটতি গ্রামীণ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি বৈষম্য সৃষ্টি করতে পারে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে উন্নয়নের পার্থক্য বাড়িয়ে দেয়।
এলাকাবাসীর দাবি, বনপুর-সাঙ্গুর ৩০টি গ্রামকে আর অবহেলার জনপদ হিসেবে রাখা যাবে না। দ্রুত ইয়াংছা হতে বনপুর ত্রিশডেবা যাতায়াতের একমাত্র সড়কটি নির্মাণ, প্রয়োজনীয় সেতু-কালভার্ট স্থাপন, নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, পার্বত্য জেলা পরিষদ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
ফাঁসিয়াখালী ১ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মংমেগ্য মার্মা বলেন, “বনপুর-সাঙ্গু এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের মূল কারণ অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা। ইয়াংছা হতে ত্রিশডেবা সড়কটি হলে শিক্ষা, চিকিৎসা ও কৃষি সব ক্ষেত্রেই মানুষের জীবন সহজ হবে। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের জোর দাবি জানাচ্ছি, যাতে এই জনপদের মানুষও উন্নয়নের সমান সুফল ভোগ করতে পারে।”
৯ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আপ্রুসিং মার্মা বলেন, আমাদের গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর উন্নয়নের আশায় অপেক্ষা করছে। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে প্রতিদিনই সাধারণ মানুষ নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আমি বিশ্বাস করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিলে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট অনেকটাই লাঘব হবে। আমি অবহেলিত এই ৩০টি গ্রামকে উন্নয়নের মূলধারায় দেখতে চাই।”
এখন প্রশ্ন একটাই উন্নয়নের মহাসড়কে যখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তখন বনপুর-সাঙ্গুর এই ৩০টি গ্রামের অর্ধ লাখ মানুষ আর কতদিন বৈষম্যের বোঝা বয়ে বেড়াবে? উন্নয়নের আলো কি আদৌ পৌঁছাবে এই জনপদে, নাকি তারা আরও বহু বছর প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় দিন গুনবে?