সাবহেড: ৬ লেন সড়ক নেই, রেললাইন নেই, গ্যাস নেই , অবকাঠামোহীন ইপিজেট (EPZ) হলে ৩ লাখ বেকারের স্বপ্ন হবে ‘বরফে ঢাকা লাশ

আহমেদ কাওছার ক্ষৌণিশ

পটুয়াখালী সদর উপজেলার আউলিয়াপুর। রাবনাবাদ নদীর তীরে পঁচাকোড়ালিয়া মৌজার ৪১০.৭৮ একর জমি এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত-সমালোচিত শিল্প প্রকল্প। নাম ‘পটুয়াখালী ইপিজেড’। বেপজার ১০ম এই ইপিজেড (EPZ) এর পেছনে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ ১,৪৩.৭৮ কোটি টাকা। লক্ষ্য ও প্রতিশ্রুতি ৩০৬টি কারখানা, ৩ লাখ চাকরি, ১.৮৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি।

প্রকল্প অনুমোদন:
একনেক (Ecnec) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয় ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে। প্রকল্পের নাম- “পটুয়াখালী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল স্থাপন”। মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ১,৪২.৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১,১০৫ কোটি টাকা এবং বেপজার নিজস্ব তহবিল ৩৮ কোটি টাকা।

দরপত্র আহ্বান:
কাজ শুর জন্য (CPTU) এর মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। রেফারেন্স নং: 03.06.7895.325.14.116.25-155 এবং প্রকাশের তারিখ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল। দরপত্র জমার শেষ তারিখ ছিলো ২০২৫ সালের ১৪ মে দুপুর ১২টা পর্যন্ত।

এই দরপত্রের প্রধান প্যাকেজ PEPZ W-22, W-23: দুটি ৬ তলা ফ্যাক্টরি ভবন নির্মাণ এবং PEPZ W-08: EPZ এর অভ্যন্তরে ২৩টি আরসিসি কালভার্ট নির্মাণ।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও শুরুর তারিখ:
এটি সবচেয়ে অস্পষ্ট জায়গা। বেপজার প্রকাশিত নথি অনুযায়ি, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি কোম্পানির নাম উল্লেখ নেই। দরপত্র আহ্বান করেছে বেপজা এর পটুয়াখালী ইপিজেড প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক। তিনিই এই চলমান প্রকল্পের পরিচালক। নাম তার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম।

জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ জটিলতার কারণে মূল ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের শেষ দিকে। ২০২৩-২৪ সালে ১২০০ জমির মালিক ক্ষতিপূরণের দাবিতে কাজে বাধা দেন। পরে বেপজা ২৬২ কোটি টাকা পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের (DC) অফিসে জমা দিলে কাজ শুরু হয়।

জুন ২০২৬ পর্যন্ত যা নির্মাণ হয়েছে:
ভূমি উন্নয়ন মাত্র ৫% শেষ হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে ১০% শেষ করার লক্ষ্য ছিলো। সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।

অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো:
৩.১৫ লাখ মিটার অভ্যন্তরীণ রাস্তার প্রাথমিক মাটির কাজ এগিয়ে গেছে। এরমধ্যে ৩০,০ মিটার ড্রেনেজ লাইনের খনন কাজ রয়েছে। কেন্দ্রীয় ইটিপি (ETP) ও স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট নেটওয়ার্কের কাজ ৮০% সম্পন্ন। রিজার্ভার ও পানি সরবরাহ লাইনের কাজ ৮০% শেষ হয়েছে।

ভবন নির্মাণ:
৪টি ৬ তলা ফ্যাক্টরি ভবন ও ৩টি ১০ তলা অফিস ভবনের ভিত্তি কাজ শুরু করা হয়েছে। নির্মাণাধীন রয়েছে জোন অফিস, কাস্টমস হাউস, সিকিউরিটি অফিস, হেলিপ্যাডের কাঠামো এবং ৫৪টি পুনর্বাসন ঘরের কাজ চলমান রয়েছে।

পর্যটন সংযোগ:
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে ৮ একর জমিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য রিসোর্ট-কাম-ইনভেস্টরস ক্লাব নির্মাণের পরিকল্পনা অনুমোদিত, যার নির্মাণ কাজ কম সময়ের মধ্যে শুরু করা হবে।

আগামীতে যা নির্মাণ করা হবে:
ভূমি উন্নয়ন শেষে প্লটের সীমানা নির্ধারণ ও রাস্তা-ড্রেন সংযোগের কাজ শেষ হলে মোট ৩০৬টি শিল্প প্লট নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

আবাসন:
শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের জন্য ৪টি ৬ তলা ও ৩টি ১০ তলা আবাসিক ভবন করা হবে।
পাওয়ার সাব-স্টেশন:
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ৩/১ কেভি সাব-স্টেশন নির্মাণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বন্ডেড ওয়্যারহাউস, স্ক্যানিং গেটসহ সিকিউরিটি ও কাস্টমস জোন নির্মাণ করা হবে।

সময়সূচি:
বেপজা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিক থেকে প্লট বরাদ্দ শুরু হবে। উৎপাদন শুরু হবে ২০২৭-২০২৮ সালে।

স্বপ্ন, পরিকল্পণা এবং বাস্তবতা:
৪১০.৭৮ একর জমি, ১,৪৩.৭৮ কোটি টাকা, ৩০৬টি প্লট আর ৩ লাখ কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি। অপার সম্ভবনার স্বপ্ন পটুয়াখালী ইপিজেড হবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতির ‘গেম চেঞ্জার’। কিন্তু বাস্তব মাঠের চিত্র বলছে অন্য কথা। ৬ লেন সড়ক নেই, রেললাইন নেই, ভোলার গ্যাস নেই।

এই তিনটি সমস্যার সমাধান না হলে পটুয়াখালী ইপিজেড পরিণত হবে একটি সর্বনাশা ‘ফ্রিজার প্রকল্পে’ -যেখানে রাষ্ট্রের টাকা ঢুকবে, কিন্তু বেকার যুবকের ঘরে ভাত উঠবে না। এটি হবে একটি নির্মম প্রতারণা, যেখানে স্বপ্ন দেখিয়ে স্বপ্নই কবর দেওয়া হবে।

ইপিজেট (EPZ) ফাঁকা পড়ে থাকবে। বেকার যুবকরা আবার ঢাকা-চট্টগ্রামের ফুটপাতে মাথা গুঁজবে। বিনিয়োগকারী প্লট বুক করে ‘ল্যান্ড ব্যাংকি‘ করবে। কারখানা হবে না। পায়রা বন্দর দিয়ে অন্য জেলার পণ্য যাবে, পটুয়াখালী শুধু ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ -হয়ে থাকবে। বৈষম্য আরও বাড়বে। ‘দক্ষিণে শিল্প হয় না’ -এই তত্ত্ব রক্ত দিয়ে লেখা হবে।

‘ফ্রিজার প্রকল্প’ -নির্মম ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান:
অবকাঠামো ছাড়া ইপিজেট (EPZ) চালু হলে যা হবে, তা শুধু আর্থিক ক্ষতি নয় -এটি মানবিক বিপর্যয়। ১.৪৩ হাজার কোটি টাকার অপচয়: জমি, রাস্তা, ড্রেন, ভবন হবে। কিন্তু কারখানা হবে না। এটি হবে রাষ্ট্রীয় অর্থের ‘ফ্রিজে রাখা লাশ’।

বেকারত্বের নির্মম অভিশাপ: স্বপ্নের মৃত্যু
এটাই সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। ৩ লাখ চাকরির ঘোষণা শুনে আউলিয়াপুরের হাজারো যুবক পড়ালেখা ছেড়ে, ধার-দেনা করে কারিগরি প্রশিক্ষণ নিয়েছে। মা-বাবা শেষ সম্বল বিক্রি করে ছেলেকে বলেছে, ইপিজেট (EPZ) হলে তোর চাকরি হবে”।

যদি EPZ না চলে, তবে এই যুবকদের কী হবে? তাদের স্বপ্ন, তাদের যৌবন, তাদের আত্মবিশ্বাস — সব বরফের মতো জমে যাবে। এটি হবে রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত ‘স্বপ্ন হত্যা’। হতাশা থেকে আত্মহত্যা, মাদক, অপরাধ বাড়বে। স্থানীয় ক্ষোভ রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে রূপ নেবে।

১২০০ পরিবারের সর্বনাশ:
১২০০ পরিবারের পৈতৃক কৃষি জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ক্ষতিপূরণ বিতরণে বিলম্ব আছে। যদি EPZ না চলে, তবে তারা জমি ও চাকরি — দুটোই হারাবে। তারা হবে ‘ভূমিহীন, কর্মহীন হয়ে ভবিষ্যত অনিশ্চয়তায় পড়ে থাকতে হবে।

ব্যাংক ঋণের ঝুঁকি:
সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক EPZ এর অবকাঠামোয় ঋণ দিয়েছে। প্রকল্প ‘সিক’ হলে NPL বাড়বে, যার বোঝা পড়বে সাধারণ আমানতকারীর ঘাড়ে।
বিদেশি বিনিয়োগে অনাস্থা: একটি EPZ ব্যর্থ হলে, বিদেশি বি