নিজস্ব প্রতিবেদক
“পৃথিবী আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া নয়; এটি আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে ধার নেওয়া।”—এই বহুল উদ্ধৃত কথাটির মধ্যেই পরিবেশ রক্ষার মূল দর্শন নিহিত রয়েছে। বিশ্ব পরিবেশ দিবস প্রতি বছর আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। এবারের প্রতিপাদ্য আমাদের আরও একবার মনে করিয়ে দিচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রকৃতিই আমাদের সবচেয়ে বড় সহযোগী।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মূল্যায়নে ঢাকার জীবনমান ও বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যানজট, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সবুজের সংকোচন রাজধানীর জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। একটি শহর তখনই বাসযোগ্য হয়, যখন সেখানে উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। কেবল উঁচু ভবন নির্মাণ কোনো শহরকে আধুনিক করে না; আধুনিক করে পরিচ্ছন্ন বাতাস, খোলা আকাশ, নিরাপদ পানি, সবুজ উদ্যান এবং সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। উপকূলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, খরা, তাপপ্রবাহ এবং ঘূর্ণিঝড় আমাদের অর্থনীতি, কৃষি ও জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলছে। তাই পরিবেশ সংরক্ষণ এখন আর বিলাসিতা নয়; এটি টিকে থাকার প্রশ্ন।
সরকার বিভিন্ন সময়ে জাতীয় বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, সামাজিক বনায়ন, উপকূলীয় বনায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নদী ও খাল পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি সংস্থা এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একটি গাছ লাগানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই গাছকে বাঁচিয়ে রাখা।
বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নের অংশ হিসেবে খাল পুনঃখনন এবং পানি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন। আজ যখন জলাবদ্ধতা, পানির সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও প্রকট, তখন খাল, বিল ও জলাশয় পুনরুদ্ধারের বিষয়টি নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। রাজধানীসহ দেশের সব শহরে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে না পারলে জলাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত সংকট আরও বাড়বে।
আমাদের উন্নয়নের দর্শনেও পরিবর্তন আনতে হবে। উন্নয়ন মানেই শুধু কংক্রিটের শহর নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জন্য বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা। প্রতিটি নতুন সড়কের পাশে গাছ, প্রতিটি আবাসন প্রকল্পে উন্মুক্ত সবুজ এলাকা, প্রতিটি ওয়ার্ডে পার্ক এবং প্রতিটি খালকে দখলমুক্ত রাখা—এসবকেই উন্নয়নের সূচক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
সরকারের সামনে এখন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। নগর পরিকল্পনা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, জলাশয় ও খাল পুনরুদ্ধার, দূষণকারী শিল্পের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণ, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন সম্প্রসারণ এবং জলবায়ু সহনশীল নগর অবকাঠামো গড়ে তোলা সময়ের দাবি।
কিন্তু সরকারের পাশাপাশি নাগরিকদেরও ভূমিকা অপরিহার্য। রাস্তা-ঘাটে ময়লা না ফেলা, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, ছাদে বা বাড়ির আঙিনায় গাছ লাগানো, জলাশয় দখলের প্রতিবাদ করা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপনকে অভ্যাসে পরিণত করা—এসবই একজন সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। সম্প্রতি বিশ্বকাপ ফুটবলে জাপান ও ব্রাজিলের ম্যাচ শেষে জাপানের সমর্থকেরা স্টেডিয়াম ছেড়ে যাওয়ার আগে নিজেদের বসার অংশের সব ময়লা-আবর্জনা নিজেরাই সংগ্রহ করে পরিচ্ছন্ন করে তবেই বিদায় নেন। জয়-পরাজয়ের আবেগের মাঝেও পরিবেশ ও জনসম্পদের প্রতি এমন দায়িত্বশীল আচরণ বিশ্ববাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে। এই সংস্কৃতি আমাদেরও শিক্ষা দেয়—পরিচ্ছন্ন দেশ গড়ার শুরুটা সরকার নয়, বরং প্রতিটি নাগরিকের নিজ নিজ দায়িত্ববোধ থেকেই।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য একটি দিনের কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আমাদের জীবনচর্চার অংশ হওয়া উচিত। আমরা যদি প্রকৃতিকে রক্ষা করি, প্রকৃতিও আমাদের রক্ষা করবে। আর যদি প্রকৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়াই, তাহলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে কেউ রেহাই পাবে না।
আজ আসুন আমরা অঙ্গীকার করি—প্রতি বছর অন্তত একটি গাছ লাগাব, একটি গাছ বাঁচাব, একটি খাল রক্ষায় ভূমিকা রাখব, প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে কাজ করব।
কারণ পরিবেশ রক্ষার লড়াই কোনো সরকার, কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো একক মানুষের নয়; এটি আমাদের সবার। আজকের সচেতনতাই আগামী দিনের নিরাপত্তা। আর সবুজ বাংলাদেশই হবে টেকসই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় ভিত্তি।
লেখক: মোঃ মিজানুর রহমান
শাখা প্রধান
রূপালী ব্যাংক পিএলসি
পিরোজপুর কর্পোরেট শাখা