মোঃ মিজানুর রহমান কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে মাদকবিরোধী অভিযানে ৪ পিস ইয়াবাসহ আর্জেন্টিনা ফ্যান হৃদয় মিয়া নামে এক যুবককে আটক করেছে যৌথ টাস্কফোর্স, পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে চার মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার খড়মপাড়া এলাকায় সোমবার বিকেলে এক বিশেষ মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেছে যৌথ টাস্কফোর্স। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এই অভিযানে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন এবং বাংলাদেশ আনসারের সমন্বিত দল হৃদয় (২৯) নামের এক ব্যক্তিকে চার পিস ইয়াবাসহ হাতেনাতে আটক করে। অভিযুক্ত হৃদয় কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার তাতারকান্দী গ্রামের বাসিন্দা মো. রাজু মিয়ার ছেলে।
মঙ্গলবার ২১ জুলাই বিকেল পাঁচটার দিকে বাদল মিয়ার বাড়ির সামনের সড়কে এই অভিযানটি সম্পন্ন হয়, যা স্থানীয় পর্যায়ে মাদক কারবারের বিস্তার রোধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। ঘটনার সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই ইয়াবা বহন করছিলেন বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
তাৎক্ষণিকভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভৈরব সার্কেলের পরিদর্শক চন্দন গোপাল সুর ভ্রাম্যমাণ আদালতে প্রসিকিউশন দাখিল করলে দায়িত্বরত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ইয়াছিন খন্দকার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযুক্ত হৃদয়কে মাদক সেবন ও বহনের দায়ে চার মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং এক হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেছেন, অনাদায়ে আরও সাজা ভোগ করতে হবে বলে আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযানের সময় আটককৃত হৃদয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা ইয়াবার পরিমাণ ও তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। যদিও জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ কম, তবুও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ধরনের খুচরা মাদক কারবারিরাই মূলত প্রান্তিক পর্যায়ে ইয়াবার বিস্তার ঘটিয়ে তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর অভিযোগ, খড়মপাড়া এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই মাদকের একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা আর্জেন্টিনা সমর্থক বা বিভিন্ন পরিচয়ের আড়ালে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়দের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারি নিয়মিত না থাকায় মাদক কারবারিরা সুযোগ বুঝে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। আটক হৃদয়ের পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে যে, কেবল খুচরা বিক্রেতা বা মাদকসেবীদের আটক করলেই মাদকের ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়। বরং এই চক্রের পেছনে থাকা মূল হোতাদের চিহ্নিত করা এবং তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, মাদকবিরোধী এই যৌথ টাস্কফোর্স অভিযান নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন দুর্গম ও জনবহুল এলাকায় মাদকের বিস্তার রোধে কঠোর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক মো. ইয়াছিন খন্দকার জানান, মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়নে প্রশাসন বদ্ধপরিকর এবং এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত কাউকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই সমন্বিত উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালেও, মাদক কারবারিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার জন্য গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। তারা মনে করেন, প্রশাসনিক তৎপরতার পাশাপাশি সামাজিকভাবে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। আটককৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং জব্দকৃত মাদকদ্রব্য ধ্বংস করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
কুলিয়ারচরের এই ঘটনাটি পরিবহন ও জনপদগুলোতে মাদক বিস্তারের ভয়াবহতার একটি ক্ষুদ্র চিত্র মাত্র। ভবিষ্যতে তরুণ প্রজন্মকে এই মরণনেশা থেকে রক্ষা করতে হলে কেবল ভ্রাম্যমাণ আদালতের দণ্ডই যথেষ্ট নয়, বরং মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধে কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার কোনো বিকল্প নেই। এই ঘটনার প্রভাব স্থানীয় তরুণদের মধ্যে কতটা আতঙ্ক বা সচেতনতা তৈরি করবে, তা এখন দেখার বিষয়। তবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই ধারাবাহিক অভিযান মাদক কারবারিদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।