মানছুর রহমান জাহিদ, পাইকগাছা, খুলনা
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দক্ষিণ সোনাতনকাটি আলহেরা দাখিল মাদরাসায় দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে কোনো শিক্ষার্থী নেই। নেই নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রম কিংবা অফিস কক্ষ। জরাজীর্ণ ও ভাঙাচোরা শ্রেণিকক্ষের কোনটি ব্যবহৃত হচ্ছে গোখাদ্যের গুদাম হিসেবে, আর কোনটি গরু-ছাগল রাখার কাজে। অথচ সরকারি কাগজপত্রে প্রতিষ্ঠানটিতে সুপারিন্টেন্ডেন্টসহ শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৭ জন।
এ অবস্থায় মাদরাসাটির সুপারিন্টেন্ডেন্ট আজগর আলীর বিরুদ্ধে ভুয়া শিক্ষার্থীদের নামে সরকারি উপবৃত্তির টাকা ও বিনা মূল্যের পাঠ্যবই উত্তোলন করে আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, শিক্ষার্থী না থাকলেও প্রতিবছর বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীর নামে বই ও উপবৃত্তির টাকা উত্তোলন করা হচ্ছে। এমনকি এভাবে তোলা বই কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়ারও অভিযোগ করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দক্ষিণ সোনাতনকাটি গ্রামে ৩২ শতক জমির ওপর ১৯৯৮ সালে সোনাতনকাটি আলহেরা দাখিল মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১ সালে তৎকালীন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ শাহ মোহা. রুহুল কুদ্দুস প্রতিষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন। প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তীতে নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থী কমতে থাকে। স্থানীয়দের দাবি, ২০১১ সাল থেকে কোনো শ্রেণিতেই একজনও নিয়মিত শিক্ষার্থী নেই।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, মাদরাসাটির ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি শ্রেণিতে ১২ থেকে ১৫ জন করে শিক্ষার্থী দেখিয়ে প্রতিবছর সরকারি উপবৃত্তির টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি চারটি শ্রেণির জন্য প্রায় ১৬০ সেট বিনা মূল্যের পাঠ্যবই বরাদ্দ দেওয়া হয়।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ের একাডেমিক সুপারভাইজার মীর নুরে আলম জানান, চলতি বছর ওই মাদরাসার পক্ষ থেকে ২২৫ সেট বইয়ের চাহিদা দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় চাহিদা অনুযায়ী বই দেওয়া হয়নি।
সরেজমিনে গিয়ে মাদরাসার ভবন ও শ্রেণিকক্ষগুলো জরাজীর্ণ অবস্থায় দেখা যায়। কক্ষগুলোতে দরজা-জানালা নেই, কোথাও রাখা আছে গোখাদ্য আবার কোথাও গরু-ছাগল বাঁধার স্পষ্ট চিহ্ন। নিয়মিত কোনো শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার পরিবেশ সেখানে নেই।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রভাষক শফিয়ার রহমান অভিযোগ করে বলেন, এত অনিয়ম ও দুর্নীতি অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় না। মাদরাসায় আসা যাবতীয় সরকারি বরাদ্দ সুপারিন্টেন্ডেন্ট ও তার স্ত্রী মিলে আত্মসাৎ করছেন। উল্লেখ্য, সুপারিন্টেন্ডেন্ট আজগর আলীর স্ত্রী রাশিদা খাতুনও ওই মাদরাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে রাশিদা খাতুন দাবি করেন, মাদরাসা ঠিকঠাক চলছে এবং তিনি নিয়মিত ক্লাস নেন। অন্যদিকে জমিদাতা আকবর মোড়ল বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যে জমি দান করেছিলাম। কিন্তু দেড় যুগ ধরে কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষা কার্যক্রম নেই। তাই জমি ফেরত চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে আবেদন করেছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসার সুপারিন্টেন্ডেন্ট আজগর আলী বলেন, মাদরাসায় কোনো সমস্যা নেই। প্রতিবছর এখান থেকে শিক্ষার্থীরা দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেয়।
তবে দীর্ঘদিন শিক্ষার্থী না থাকা এবং বই ও উপবৃত্তির টাকা উত্তোলনের বিষয়ে তিনি কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, বিষয়টির খোঁজখবর নিয়ে গুরুত্বসহকারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ দিকে শিক্ষার্থীহীন প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা উন্মোচনের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।