মোঃ মিজানুর রহমান কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
কিশোরগঞ্জের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে রোগীর স্বজনকে রুমে আটকে রেখে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও মারধরের অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে হাসপাতাল এলাকায় চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
শনিবার (১৩ জুন) সকালে হাসপাতালের বহির্বিভাগের ১৩৭ নম্বর কক্ষে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটে।
ভুক্তভোগী মো. উবায়দুল্লাহ কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার পাটুয়াভাঙ্গা ইউনিয়নের শিমুলিয়া গ্রামের আব্দুস বাছেদের ছেলে। অন্যদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসক ডা. ইসরাত জাহান মৌ ওই হাসপাতালের চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত। তিনি শহরে ‘ডা. ইসরাত জাহান মৌ স্কিন অ্যান্ড লেজার কেয়ার সেন্টার’ নামে একটি ব্যক্তিগত চেম্বার পরিচালনা করেন।
লিখিত অভিযোগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার সকাল ৯টার দিকে উবায়দুল্লাহ তার অসুস্থ স্ত্রী ও আট মাস বয়সি সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসেন। চিকিৎসক সময়মতো উপস্থিত না হওয়ায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে তিনি মোবাইল ফোনে একটি ভিডিও ধারণ করেন এবং অন্য রোগীদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। চিকিৎসকের সহকারী বিষয়টি ডা. মৌকে জানালে প্রায় দুই ঘণ্টা পর বেলা ১১টার দিকে তিনি কক্ষে আসেন।
ভুক্তভোগী উবায়দুল্লাহর দাবি, তিনি কক্ষে প্রবেশ করার পরপরই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকেই কয়েকজন ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। চিকিৎসক তার পরিচয় জানতে চান এবং ভিডিও ধারণের কারণ জিজ্ঞেস করে সেটি মুছে ফেলতে চাপ দেন। একপর্যায়ে চিকিৎসকের নির্দেশে হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ তাকে ঘিরে ধরে মারধর শুরু করেন। এমনকি চিকিৎসক নিজেও তার জামার কলার ধরে টানাহেঁচড়া করেন এবং গলা চেপে ধরেন।
এসময় তার অসুস্থ স্ত্রী ও কোলে থাকা আট মাসের শিশুসন্তান ভয়ে চিৎকার করতে থাকেন। পরে বাইরে থাকা অন্য রোগীরা এগিয়ে এসে দরজা খোলার চেষ্টা করলে উবায়দুল্লাহ সেখান থেকে বের হতে সক্ষম হন। ঘটনার পরপরই তিনি কিশোরগঞ্জ সিভিল সার্জন বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বেশ কয়েকজন রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, হঠাৎ করেই ১৩৭ নম্বর কক্ষের ভেতর থেকে উচ্চশব্দ ও মারধরের আওয়াজ শোনা যায়। দরজা বন্ধ থাকায় বাইরে থাকা সাধারণ রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কিছু সময় পর দরজা খোলা হলে একজন ব্যক্তিকে অত্যন্ত বিপর্যস্ত ও উত্তেজিত অবস্থায় বের হতে দেখা যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ডা. ইসরাত জাহান মৌ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পান। ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে জেলখানা মোড় এলাকায় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে বাগবিতণ্ডায় জড়িয়েছিলেন তিনি।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে সরকারি হাসপাতালে দায়িত্বে অবহেলা করে রোগীদের নিজের ব্যক্তিগত ক্লিনিকে ভাগিয়ে নেওয়ার অসংখ্য পুরোনো অভিযোগ রয়েছে। তার পরামর্শ না শুনলে রোগীদের সঙ্গে চরম আপত্তিকর আচরণ করা হয় বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব ইয়াজ ইবনে জসিম বলেন, সরকারি হাসপাতালে এসে যদি সাধারণ মানুষ এভাবে হেনস্তা ও মারধরের শিকার হয়, তাহলে মানুষের যাওয়ার আর কোনো জায়গা থাকে না।
মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া এই ডাক্তার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালেও আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছিলেন। আমরা অবিলম্বে এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করে দোষী চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. ইসরাত জাহান মৌ মারধরের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, অভিযোগকারী উবায়দুল্লাহ হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে নিয়মবহির্ভূতভাবে ভিডিও ধারণ করছিলেন এবং সিরিয়াল অমান্য করে জোরপূর্বক আমার কক্ষে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
এসময় কক্ষে থাকা অন্য রোগীদের সঙ্গেই তার বাগবিতণ্ডা হয়। তিনি প্রথমে আমার সাহায্যকারীকে এবং পরে আমাকেও ধাক্কা দেন।
তার বিরুদ্ধে আনা কলার ধরা বা গলা চেপে ধরার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি সদর মডেল থানায় একটি লিখিত পাল্টা অভিযোগ দায়ের করেছেন।
২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক) ডা. নূর মো. শামসুল আলম দাবি করেন, রোগীর স্বজনকে মারধরের অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
উল্টো অভিযোগকারী উবায়দুল্লাহই চিকিৎসকের সঙ্গে অসদাচরণ করেছেন এবং তার ওপর হামলা চালিয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন (দায়িত্বপ্রাপ্ত) ডা. মো. নাজমুল করিম জানান, এই ঘটনায় একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। দ্রুতই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে এবং তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম ভূঁইয়া জানান, ভুক্তভোগী উবায়দুল্লাহ থানায় এসেছিলেন। তাকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অভিযুক্ত চিকিৎসকও থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
মন্তব্য করুন