ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশদ্বার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের নামে নির্মিত চত্বর অপসারণকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একদিকে দীর্ঘদিন ধরে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতার কারণে চত্বরটি অপসারণের দাবি ছিল স্থানীয়দের। অন্যদিকে ৩২ লাখ টাকার প্রকল্পে পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণ না হওয়া এবং প্রকল্প-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকদিন ধরে কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় চত্বরটি ভাঙার কাজ চলছে। তবে কার নির্দেশে এবং কোন সংস্থার তত্ত্বাবধানে এ কাজ হচ্ছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, ২০১৪ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ এবং তৎকালীন পৌর মেয়র সাইদুল করিম মিন্টুর উপস্থিতিতে ‘বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বর’ প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়। প্রকল্পটির জন্য ৩২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্যের পরিবর্তে সেখানে শুধু একটি বড় পাথর স্থাপন করা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপর আর প্রকল্পের কাজ এগোয়নি।
ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খান জানান, প্রকল্পের শুরুতে প্রায় ১১ লাখ টাকা উত্তোলন করে কাজ শুরু হয়েছিল। তবে পরে কী হয়েছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। এমনকি প্রকল্প-সংক্রান্ত মূল ফাইলটিও বর্তমানে পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
ঝিনাইদহ পৌরসভার প্রশাসক রথিন্দ্র নাথ রায় বলেন, “চত্বর অপসারণের কাজটি পৌরসভার পক্ষ থেকে করা হচ্ছে না। কারা করছে, সে বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।”
বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, তাদের কিছু না জানিয়েই চত্বরটি অপসারণ করা হচ্ছে। তারা এটিকে বীরশ্রেষ্ঠের স্মৃতির প্রতি অবহেলা হিসেবে উল্লেখ করে যথাযথ মর্যাদায় একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের ভাষ্য, ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়কের সংযোগস্থলের মাঝখানে চত্বরটি থাকায় দীর্ঘদিন ধরে যান চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। উঁচু কাঠামোর কারণে সড়কের এক পাশ থেকে অন্য পাশের যানবাহন দেখা যেত না, ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছিল।
বাসচালক সাগর হোসেন বলেন, “এখানে গাড়ি ঘোরাতে অনেক সমস্যা হতো। ছোট-বড় দুর্ঘটনাও ঘটেছে। চত্বরটি সরিয়ে দিলে যান চলাচল সহজ হবে। তবে আমরা চাই, বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ও দৃষ্টিনন্দন ভাস্কর্য শহরের উপযুক্ত স্থানে নির্মাণ করা হোক।”
কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সময় নিয়ন্ত্রক আবু জাফর জানান, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় চত্বরটি অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছিল। সেখানে প্রকাশ্যে মাদকসেবনসহ বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড চলত, যা যাত্রী ও পথচারীদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
সাবেক জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মাসউদ বলেন, জনদুর্ভোগ কমানো এবং সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় চত্বরটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে সেই সিদ্ধান্তই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
ঝিনাইদহ জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক আব্দুল মজিদ বলেন, সেখানে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের কোনো পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে বলে তার জানা নেই।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামালুজ্জামান বলেন, “যদি সেখানে বীরশ্রেষ্ঠের পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নির্মাণ হতো, তাহলে অবশ্যই আমরা জানতাম। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে নতুন বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।”
চত্বর অপসারণ, ৩২ লাখ টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া এবং প্রকল্পের মূল ফাইল নিখোঁজ থাকার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, প্রকল্পের আর্থিক ও প্রশাসনিক বিষয় তদন্ত করে প্রকৃত তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা হোক। একই সঙ্গে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী মোহাম্মদ হামিদুর রহমানের স্মৃতিকে যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণের লক্ষ্যে উপযুক্ত স্থানে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নান্দনিক ভাস্কর্য নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক।
মন্তব্য করুন