প্রতি বছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হলেও বাস্তব চিত্রে বান্দরবানের লামা উপজেলায় পরিবেশ ধ্বংসের প্রবণতা থেমে নেই। পরিবেশ রক্ষার নানা প্রতিশ্রুতি, সচেতনতামূলক কর্মসূচি ও সরকারি উদ্যোগের কথা শোনা গেলেও পাহাড় কাটা, অবৈধ ইটভাটা, বন উজাড়, পাহাড়ি ছড়া ও ঝিরি দখল, বালু উত্তোলন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ নিধনের কারণে লামার পরিবেশ দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে।
উপজেলায় প্রায় ৪০টি অবৈধ ইট ভাটা, এবং উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে প্রায় হাজারো অবৈধ বালুর পয়েন্ট থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও বনভূমি ধ্বংসের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ খুব একটা চোখে পড়ে না। একদিকে যেমন নতুন বসতি ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের জন্য পাহাড় কাটা হচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও কাঠের চাহিদা মেটাতে উজাড় করা হচ্ছে বনাঞ্চল। এতে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ার পাশাপাশি বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, লামা একসময় প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ একটি জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। বাঁশ, ছন, বেত, বিভিন্ন প্রজাতির বনজ গাছ এবং পাহাড়ি ঝিরি-ছড়ায় ভরপুর ছিল এই অঞ্চল। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অবৈধ দখল এবং পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের কারণে এসব সম্পদ এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জীবন-জীবিকাও হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে যখন সারা বিশ্ব পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা দিচ্ছে, তখন লামার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ ইটভাটার কালো ধোঁয়া পরিবেশ দূষণ বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়া পরিচালিত অনেক ইটভাটা কৃষিজমি ও বনাঞ্চলের ক্ষতি করছে। এসব ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে কাঠ ব্যবহারের কারণেও বন উজাড়ের মাত্রা বাড়ছে।
এছাড়া পাহাড়ি ছড়া ও ঝিরিগুলো ভরাট এবং দখলের কারণে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, পরিবেশ রক্ষায় কেবল দিবস পালন নয়, প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ ও কঠোর নজরদারি।
সচেতন মহল বলছে, লামার পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় এখনই উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পরিবেশগত সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দিতে পাহাড়, বনভূমি, ছড়া-ঝিরি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই দিনে লামাবাসীর প্রত্যাশা—শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় দৃশ্যমান এবং টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশে থাকতে পারে।
মন্তব্য করুন